মোবাইল ব্যাংকিংয়ে উপবৃত্তি হ-য-ব-র-ল
শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের সরকারের যতগুলো যুগান্তকারী
পদক্ষেপ,তার মধ্যে ‘উপবৃত্তি’ অন্যতম।এর কারণে ঝরেপড়া সবচেয়ে বেশী রোধ হয়েছে, শিশুদের স্কুল গামীতা বৃদ্ধি পেয়েছে,শিশু শ্রম কমেছে , মেয়েদের পড়াশুনায় আগ্রহ
বেড়েছে , দরিদ্র বাবা-মা’র সন্তানের লেখাপড়ার খরচের দুশ্চিন্তা কমেছে , শিক্ষার্থীদের শ্রেণিতে উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে ,পরীক্ষায় কাম্য নম্বর পাবার জন্য শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় মনযোগিতা বেড়েছে ,
ইত্যাদি আরো কতো কী !
প্রাথমিক স্তরে সর্বপ্রথম শিক্ষা সহায়তা হিসেবে
‘শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য’ কর্মসূচি চালু করা হয়েছিল । তখন দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের গম কিংবা চাল প্রদান করা
হতো । সে সময় স্কুল ম্যানেজিং
কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক মিলে শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসুচির গম বা চাল উত্তোলন
করে বিতরণ করতেন । এভাবে চলেছে বহুদিন । দেখা গেলো, এ নিয়ে কোন কোন জায়গায়
কেলেংকারি হয়েছে । ভুয়া মাস্টার রোল দাখিল করে কতো দু’ নম্বরী হয়েছে
, তার সঠিক হিসেব কে জানে ? তারপর বন্ধ হলো এটা । চালু হলো উপবৃত্তি কার্যক্রম । ব্যাংকের লোকজনের মাধ্যমে সরাসরি নগদ টাকায়
শিক্ষা সহায়তা বা উপবৃত্তি প্রদান ।
এরপর উপবৃত্তি প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরে
প্রসারিত হলো। প্রথম অবস্থায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সকল মেয়ে শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেয়া
হতো । এক সময় মেয়ে শিক্ষার্থী
প্রচুর বেড়ে গেল । তাই সকল মেয়ে শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেয়া বন্ধ করে কেবল ৩০% ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি
চালু হলো । এর ও আরো পরে ১০% ছেলেদের । এখন এ ভাবেই চলছে । তবে তা বর্তমানে ডিগ্রি স্তর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়েছে
। আর প্রাথমিক স্তরে
এবার ১০০% শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে । দূর ভবিষ্যতে হয়ত সকল স্তরে শত ভাগ শিক্ষার্থী
উপবৃত্তি সুবিধা পাবে-সে প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি ।
সে যাই হোক, এতদিন ব্যাংকের লোকজন নির্দিষ্ট দিনে স্কুল-কলেজে গিয়ে সরাসরি উপবৃত্তি প্রকল্পের
আওতাভুক্ত শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্তরে অভিভাবকদের এবং অন্যান্য স্তরে শিক্ষার্থীদের
হাতে হাতে নগদ টাকা দিয়ে যেত । সাথে শিক্ষা অফিসের কোন প্রতিনিধি থাকতেন । এর ইতিবাচক দিক ছিল
অনেক । এতে সরকারের এ মহৎ
কাজটি সবার দৃষ্টিগোচর হতো । পূর্বাহ্নেই শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকগণ জানতে পারতেন ,
কোনদিন তারা উপবৃত্তির টাকা পেতে যাচ্ছেন । ব্যাংকের লোকজন ও শিক্ষা
অফিসার কিংবা তার প্রতিনিধি সত্যিকারের প্রাপককে সরেজমিন চিহ্নিত ও যাচাই-বাছাই করে
উপবৃত্তির টাকা বিতরণ করতে পারতেন । যথাস্থানে প্রাপকের স্বাক্ষর গ্রহণ করে টাকা প্রদান করা হতো
। ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা
নিশ্চিত হবার অবাধ সুযোগ ছিল । একটি প্রতিষ্ঠানে প্রতি কিস্তিতে কত টাকা বন্টন হলো আর কত টাকা
অবন্টনকৃত থেকে গেলো , তা’ ব্যাংকের লোকজন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান ভালো করে জানতে
পারতেন । উপবৃত্তির ভর্তূকি বাবদ প্রতিষ্ঠান কতো টাকা টিউশন ফি পাচ্ছে , তার ও একটা সুস্পষ্ট ধারণা সকলে পেতেন । উপবৃত্তি বন্টন শীটে
সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, ব্যাংক কর্মকর্তা ও
শিক্ষা অফিসারের স্বাক্ষর থাকতো। কিন্তু, তাতে ও অনিয়ম বা কেলেংকারী
যে একেবারে বন্ধ হয়েছিল – তা কিন্তু নয় ।
সম্প্রতি আমাদের উপবৃত্তিতে মোবাইল ব্যাংকিং
চালু হয়েছে । বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ডাচ বাংলা ব্যাংক কাজটি পেয়েছে । এখন প্রাইমারি থেকে শুরু করে উপবৃত্তি প্রকল্পের
আওতাভুক্ত সকলকে ডাচ বাংলা ব্যাংকে মোবাইল একাউন্ট খুলতে হয়েছে । অনেকে ভেবেছেন,
খুব ভাল হয়েছে । ঘরে বসেই টাকা পাওয়া যাবে । কিন্তু, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা যে বেশী – সে বিষয়ে এখানে একটু আলোকপাত করা একান্ত আবশ্যক । সংশ্লিষ্ট সকলকে মোবাইল একাউন্ট খুলতে গিয়ে
নিঃসন্দেহে ছবি ওঠানো ও ফরম পুরণ সহ নানা যন্ত্রণা প্রথমেই পোহাতে হয়েছে । মোবাইল একাউন্ট চালু
করার পর সংশ্লিষ্টরা যে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন , তার ক’টি মাত্র নীচে তুলে ধরার জন্য আজকের এ প্রয়াস।
প্রথমত, ডাচ বাংলা ব্যাংকের শাখা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নেই।মূলতঃ প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল ও মফস্বলে উপবৃত্তির সুবিধা ভোগীদের
বসবাস । তাই, যে কোন সুবিধা-অসুবিধায় ব্যাংকের সাথে যোগাযোগের
কোন সহজ সুযোগ তাদের নেই ।
দ্বিতীয়ত , মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য প্রত্যেক সুবিধা ভোগীর নিজস্ব মোবাইল সেট থাকা আবশ্যক
। কিন্তু, এখনো প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এমন হত দরিদ্র কিছু পরিবার পাওয়া
যাবে , যাদের মোবাইল নেই । অবশ্য, এদের সংখ্যা একান্তই নগন্য । তাই, যে দু’-চার পরিবারে মোবাইল নেই , তারা প্রতিবেশী কিংবা কোন আত্মীয়ের মোবাইল নম্বরে হয়ত একাউন্ট খুলেছেন । এখন ঐ প্রতিবেশী কিংবা
আত্মীয়ের সাথে যে কোন কারণে সম্পর্কের অবনতি হয়ে থাকলে উপবৃত্তির টাকা এখন কার হাতে
যাবে, সে তো সহজেই অনুমেয় ।
তৃতীয়ত , কবে-কখন-কোনদিন উপবৃত্তির টাকা মোবাইল একাউন্টে দেয়া হচ্ছে , তা পূর্বাহ্নে জানার কোন সুযোগ নেই । গ্রামে লেখাপড়া না জানা অনেকেই আছেন। তারা মোবাইলে ম্যাসেজ
পড়তে জানেন না । আবার অহরহ নানা ম্যাসেজ আসে বলে অনেকে ম্যাসেজ না পড়েই তা ডিলিট করে দেন । এর ফলে অনেকের উপবৃত্তির
ম্যাসেজটি জানার আগেই কাটা পড়ে যায় ।
চতুর্থত , এই তো মাত্র ক’মাস আগে আমাদের দেশে মোবাইল সিম রেজিস্ট্রেশন
চালু হয়। এর আগে বেশির ভাগ অনিবন্ধিত সিম ছিল । অনেকে মোবাইল একাউন্ট খুলেছিলেন অনিবন্ধিত সিম দিয়ে । পরবর্তীতে তা হেরে
যাওয়ায় তা আর উঠানোর সুযোগ কিংবা নিবন্ধনের সুযোগ পাননি । এখন তাদের কী হবে? কে তাদের পরামর্শ বা পথটুকু বাতলে দেবে ?
পঞ্চমত , বিনা নোটিশে মোবাইলে উপবৃত্তির টাকা পাঠানো হয় । সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা তার প্রতিষ্ঠান এর কিছুই জানে না। আবার এক সাথে সকলে
পায় ও না । কেউ এক সপ্তাহ আগে , কেউ এক সপ্তাহ পরে
। পরে যে পায়,
তার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই । আবার অনেকে পায় ও না। সংশ্লিষ্ট অভিভাবক
বা শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠান প্রধানের সাথে কিংবা প্রতিষ্ঠানের অফিসের সাথে যোগাযোগ করে
কিছু জানবার সুযোগ ও নেই।একেবারে যেন গোলক ধাঁ ধাঁ !
ষষ্ঠত , উপবৃত্তির টাকা তোলার জন্য যে কোন বিকাশ এজেন্টের কাছে যেতে হয় । এজেন্টরা উপবৃত্তির
সুবিধা ভোগীদের ইচ্ছে মতো হয়রানী করে । সহজ-সরল, লেখাপড়া না জানা গ্রামের
অভিভাবকদের উপবৃত্তির টাকায় ইচ্ছে মতো তারা ভাগ বসায় । অনেককে বহু দূর গিয়ে বিকাশ এজেন্টের শরণাপন্ন
হতে হয় । বিকাশ এজেন্টরা সহজ সরল গ্রামের লোকদের কাছ থেকে প্রায়শঃ শ’-পঞ্চাশ টাকা চার্জের কথা বলে কেটে রাখে । কোথাও আরো বেশী ।
সপ্তমত , কোন কোন সময় একই ক্যাটাগরির দু’জন শিক্ষার্থী সমান
টাকা পায় না । এর কারণটা ও অজানা থেকে যায় ।কখনো দেখা যায়, একই ক্যাটাগরি
কেউ এক সাথে দুই কিস্তি পেয়ে যাচ্ছে আবার কেউ বা এক কিস্তি । এমন ও হয়, একই ক্যাটাগরির অন্য জন হয়তবা পায়ই না ।
এ পরিস্থিতিতে উপবৃত্তির ক্ষেত্রে চরম এক
হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে । সরকারের এ মহৎ কর্মযজ্ঞটি সাধারণ লোকজনের দৃষ্টির অন্তরালে চলে
গেছে । স্কুল কিংবা কলেজ কর্তৃপক্ষ
এ বিষয়ে কোন কিছু জানতে পারেন না। কে টাকা পাচ্ছে, কে পাচ্ছে না-পেয়ে
থাকলে কে, কত টাকা করে পাচ্ছে সে সবের হিসেবটা ও প্রতিষ্ঠানকে
সরবরাহ করা হয় না। শিক্ষা অফিসাররা ও এর কিছুই বলতে পারেন না।
এভাবে হলে উপবৃত্তির টাকা হরিলুটের কী অবারিত
সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না ? মোবাইল ব্যাংকিংয়ে
উপবৃত্তি কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষা
কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা প্রদান করা আবশ্যক। অন্যথায় উপবৃত্তি প্রকল্পটি
মাঠে মারা যাবার সমূহ আশংকা বিদ্যমান।
লেখক : অধ্যক্ষ ও দৈনিক শিক্ষার নিয়মিত কলাম
লেখক।
No comments:
Post a Comment