Tuesday, September 20, 2016

দৈনিক শিক্ষা বিষয়ক আপডেট


মোবাইল ব্যাংকিংয়ে উপবৃত্তি হ-য-ব-র-ল

শিক্ষা ক্ষেত্রে আমাদের সরকারের যতগুলো যুগান্তকারী পদক্ষেপ,তার মধ্যে উপবৃত্তিঅন্যতমএর কারণে ঝরেপড়া সবচেয়ে বেশী রোধ হয়েছে, শিশুদের স্কুল গামীতা বৃদ্ধি পেয়েছে,শিশু শ্রম কমেছে , মেয়েদের পড়াশুনায় আগ্রহ বেড়েছে , দরিদ্র বাবা-মার সন্তানের লেখাপড়ার খরচের দুশ্চিন্তা কমেছে , শিক্ষার্থীদের শ্রেণিতে উপস্থিতি বৃদ্ধি পেয়েছে ,পরীক্ষায় কাম্য নম্বর পাবার জন্য শিক্ষার্থীদের পড়াশুনায় মনযোগিতা বেড়েছে , ইত্যাদি আরো কতো কী !

প্রাথমিক স্তরে সর্বপ্রথম শিক্ষা সহায়তা হিসেবে শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্যকর্মসূচি চালু করা হয়েছিল তখন দরিদ্র পরিবারের শিক্ষার্থীদের গম কিংবা চাল প্রদান করা হতো সে সময় স্কুল ম্যানেজিং কমিটির সভাপতি ও প্রধান শিক্ষক মিলে শিক্ষার বিনিময়ে খাদ্য কর্মসুচির গম বা চাল উত্তোলন করে বিতরণ করতেন এভাবে চলেছে বহুদিন দেখা গেলো, এ নিয়ে কোন কোন জায়গায় কেলেংকারি হয়েছে ভুয়া মাস্টার রোল দাখিল করে কতো দুনম্বরী হয়েছে , তার সঠিক হিসেব কে জানে ? তারপর বন্ধ হলো এটা চালু হলো উপবৃত্তি কার্যক্রম ব্যাংকের লোকজনের মাধ্যমে সরাসরি নগদ টাকায় শিক্ষা সহায়তা বা উপবৃত্তি প্রদান

এরপর উপবৃত্তি প্রাথমিক থেকে মাধ্যমিক স্তরে প্রসারিত হলোপ্রথম অবস্থায় ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণি পর্যন্ত সকল মেয়ে শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেয়া হতো এক সময় মেয়ে শিক্ষার্থী প্রচুর বেড়ে গেল তাই সকল মেয়ে শিক্ষার্থীকে উপবৃত্তি দেয়া বন্ধ করে কেবল ৩০% ছাত্রীদের জন্য উপবৃত্তি চালু হলো এর ও আরো পরে ১০% ছেলেদের এখন এ ভাবেই চলছে তবে তা বর্তমানে ডিগ্রি স্তর পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হয়েছে আর প্রাথমিক স্তরে এবার ১০০% শিক্ষার্থীদের উপবৃত্তির আওতায় আনা হয়েছে দূর ভবিষ্যতে হয়ত সকল স্তরে শত ভাগ শিক্ষার্থী উপবৃত্তি সুবিধা পাবে-সে প্রত্যাশা আমরা করতেই পারি

সে যাই হোক, এতদিন ব্যাংকের লোকজন নির্দিষ্ট দিনে স্কুল-কলেজে গিয়ে সরাসরি উপবৃত্তি প্রকল্পের আওতাভুক্ত শিক্ষার্থীদের প্রাথমিক স্তরে অভিভাবকদের এবং অন্যান্য স্তরে শিক্ষার্থীদের হাতে হাতে নগদ টাকা দিয়ে যেত সাথে শিক্ষা অফিসের কোন প্রতিনিধি থাকতেন এর ইতিবাচক দিক ছিল অনেক এতে সরকারের এ মহৎ কাজটি সবার দৃষ্টিগোচর হতো পূর্বাহ্নেই শিক্ষার্থী ও তাদের অভিভাবকগণ জানতে পারতেন , কোনদিন তারা উপবৃত্তির টাকা পেতে যাচ্ছেন ব্যাংকের লোকজন ও শিক্ষা অফিসার কিংবা তার প্রতিনিধি সত্যিকারের প্রাপককে সরেজমিন চিহ্নিত ও যাচাই-বাছাই করে উপবৃত্তির টাকা বিতরণ করতে পারতেন যথাস্থানে প্রাপকের স্বাক্ষর গ্রহণ করে টাকা প্রদান করা হতো ফলে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবার অবাধ সুযোগ ছিল একটি প্রতিষ্ঠানে প্রতি কিস্তিতে কত টাকা বন্টন হলো আর কত টাকা অবন্টনকৃত থেকে গেলো , তাব্যাংকের লোকজন ও সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান ভালো করে জানতে পারতেন উপবৃত্তির ভর্তূকি বাবদ প্রতিষ্ঠান কতো টাকা টিউশন ফি পাচ্ছে , তার ও একটা সুস্পষ্ট ধারণা সকলে পেতেন উপবৃত্তি বন্টন শীটে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান প্রধান, ব্যাংক কর্মকর্তা ও শিক্ষা অফিসারের স্বাক্ষর থাকতোকিন্তু, তাতে ও অনিয়ম বা কেলেংকারী যে একেবারে বন্ধ হয়েছিল তা কিন্তু নয়

সম্প্রতি আমাদের উপবৃত্তিতে মোবাইল ব্যাংকিং চালু হয়েছে বেশীর ভাগ ক্ষেত্রে ডাচ বাংলা ব্যাংক কাজটি পেয়েছে এখন প্রাইমারি থেকে শুরু করে উপবৃত্তি প্রকল্পের আওতাভুক্ত সকলকে ডাচ বাংলা ব্যাংকে মোবাইল একাউন্ট খুলতে হয়েছে অনেকে ভেবেছেন, খুব ভাল হয়েছে ঘরে বসেই টাকা পাওয়া যাবে কিন্তু, মোবাইল ব্যাংকিংয়ে সুবিধার চেয়ে অসুবিধা যে বেশী সে বিষয়ে এখানে একটু আলোকপাত করা একান্ত আবশ্যক সংশ্লিষ্ট সকলকে মোবাইল একাউন্ট খুলতে গিয়ে নিঃসন্দেহে ছবি ওঠানো ও ফরম পুরণ সহ নানা যন্ত্রণা প্রথমেই পোহাতে হয়েছে মোবাইল একাউন্ট চালু করার পর সংশ্লিষ্টরা যে বিড়ম্বনার শিকার হচ্ছেন , তার কটি মাত্র নীচে তুলে ধরার জন্য আজকের এ প্রয়াস

প্রথমত, ডাচ বাংলা ব্যাংকের শাখা প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে নেইমূলতঃ প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চল ও মফস্বলে উপবৃত্তির সুবিধা ভোগীদের বসবাস তাই, যে কোন সুবিধা-অসুবিধায় ব্যাংকের সাথে যোগাযোগের কোন সহজ সুযোগ তাদের নেই

দ্বিতীয়ত , মোবাইল ব্যাংকিংয়ের জন্য প্রত্যেক সুবিধা ভোগীর নিজস্ব মোবাইল সেট থাকা আবশ্যক কিন্তু, এখনো প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে এমন হত দরিদ্র কিছু পরিবার পাওয়া যাবে , যাদের মোবাইল নেই অবশ্য, এদের সংখ্যা একান্তই নগন্য তাই, যে দু’-চার পরিবারে মোবাইল নেই , তারা প্রতিবেশী কিংবা কোন আত্মীয়ের মোবাইল নম্বরে হয়ত একাউন্ট খুলেছেন এখন ঐ প্রতিবেশী কিংবা আত্মীয়ের সাথে যে কোন কারণে সম্পর্কের অবনতি হয়ে থাকলে উপবৃত্তির টাকা এখন কার হাতে যাবে, সে তো সহজেই অনুমেয়

তৃতীয়ত , কবে-কখন-কোনদিন উপবৃত্তির টাকা মোবাইল একাউন্টে দেয়া হচ্ছে , তা পূর্বাহ্নে জানার কোন সুযোগ নেই গ্রামে লেখাপড়া না জানা অনেকেই আছেনতারা মোবাইলে ম্যাসেজ পড়তে জানেন না আবার অহরহ নানা ম্যাসেজ আসে বলে অনেকে ম্যাসেজ না পড়েই তা ডিলিট করে দেন এর ফলে অনেকের উপবৃত্তির ম্যাসেজটি জানার আগেই কাটা পড়ে যায়

চতুর্থত , এই তো মাত্র কমাস আগে আমাদের দেশে মোবাইল সিম রেজিস্ট্রেশন চালু হয়এর আগে বেশির ভাগ অনিবন্ধিত সিম ছিল অনেকে মোবাইল একাউন্ট খুলেছিলেন অনিবন্ধিত সিম দিয়ে পরবর্তীতে তা হেরে যাওয়ায় তা আর উঠানোর সুযোগ কিংবা নিবন্ধনের সুযোগ পাননি এখন তাদের কী হবে? কে তাদের পরামর্শ বা পথটুকু বাতলে দেবে ?

পঞ্চমত , বিনা নোটিশে মোবাইলে উপবৃত্তির টাকা পাঠানো হয় সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থী, অভিভাবক কিংবা তার প্রতিষ্ঠান এর কিছুই জানে নাআবার এক সাথে সকলে পায় ও না কেউ এক সপ্তাহ আগে , কেউ এক সপ্তাহ পরে পরে যে পায়, তার দুশ্চিন্তার অন্ত নেই আবার অনেকে পায় ও নাসংশ্লিষ্ট অভিভাবক বা শিক্ষার্থী প্রতিষ্ঠান প্রধানের সাথে কিংবা প্রতিষ্ঠানের অফিসের সাথে যোগাযোগ করে কিছু জানবার সুযোগ ও নেইএকেবারে যেন গোলক ধাঁ ধাঁ !

ষষ্ঠত , উপবৃত্তির টাকা তোলার জন্য যে কোন বিকাশ এজেন্টের কাছে যেতে হয় এজেন্টরা উপবৃত্তির সুবিধা ভোগীদের ইচ্ছে মতো হয়রানী করে সহজ-সরল, লেখাপড়া না জানা গ্রামের অভিভাবকদের উপবৃত্তির টাকায় ইচ্ছে মতো তারা ভাগ বসায় অনেককে বহু দূর গিয়ে বিকাশ এজেন্টের শরণাপন্ন হতে হয় বিকাশ এজেন্টরা সহজ সরল গ্রামের লোকদের কাছ থেকে প্রায়শঃ শ’-পঞ্চাশ টাকা চার্জের কথা বলে কেটে রাখে কোথাও আরো বেশী

সপ্তমত , কোন কোন সময় একই ক্যাটাগরির দুজন শিক্ষার্থী সমান টাকা পায় না এর কারণটা ও অজানা থেকে যায় কখনো দেখা যায়, একই ক্যাটাগরি কেউ এক সাথে দুই কিস্তি পেয়ে যাচ্ছে আবার কেউ বা এক কিস্তি এমন ও হয়, একই ক্যাটাগরির অন্য জন হয়তবা পায়ই না

এ পরিস্থিতিতে উপবৃত্তির ক্ষেত্রে চরম এক হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে সরকারের এ মহৎ কর্মযজ্ঞটি সাধারণ লোকজনের দৃষ্টির অন্তরালে চলে গেছে স্কুল কিংবা কলেজ কর্তৃপক্ষ এ বিষয়ে কোন কিছু জানতে পারেন নাকে টাকা পাচ্ছে, কে পাচ্ছে না-পেয়ে থাকলে কে, কত টাকা করে পাচ্ছে সে সবের হিসেবটা ও প্রতিষ্ঠানকে সরবরাহ করা হয় নাশিক্ষা অফিসাররা ও এর কিছুই বলতে পারেন না

এভাবে হলে উপবৃত্তির টাকা হরিলুটের কী অবারিত সুযোগ সৃষ্টি হচ্ছে না ? মোবাইল ব্যাংকিংয়ে উপবৃত্তি কার্যক্রমের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে প্রতিষ্ঠান প্রধান ও শিক্ষা কর্মকর্তাদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করতে ব্যাংক কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা প্রদান করা আবশ্যকঅন্যথায় উপবৃত্তি প্রকল্পটি মাঠে মারা যাবার সমূহ আশংকা বিদ্যমান

লেখক : অধ্যক্ষ ও দৈনিক শিক্ষার নিয়মিত কলাম লেখক


No comments:

Post a Comment