Wednesday, October 23, 2019
নার্সিসিজম কি? ফেইসবুকের যুগে নার্সিসিজম
#নার্সিসিজম
#ফেইসবুকিংয়ের_যুগে_নার্সিসিজম
আমরা একবিংশ শতাব্দীর অধিবাসী হলেও অনেকেই ‘নার্সিসিজম’ শব্দ বা ধারণার সঙ্গে খুব একটা পরিচিত নয়। তবে এটাও সত্যি যে, আমাদের তরুণ সমাজ এই ধারণার সঙ্গে পরিচিত না হলেও তারা এই ধারণা দ্বারা ব্যাপকভাবে প্রভাবিত। নার্সিসিজম শব্দ এবং ধারণার উৎস প্রাচীন গ্রিসে হলেও এটি আর অপ্রচলিত কোনো শব্দ না; বরং এটি আমাদের তরুণ প্রজন্মের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হয়ে উঠেছে। নার্সিসিজম বলতে নিজের অত্যধিক প্রশংসা এবং নিজের সৌন্দর্যের প্রতি খুব বেশি পরিমাণে আসক্ত (মুগ্ধ) হওয়ার অভ্যাসকে বোঝায়।
যুক্তরাষ্ট্রে বেশ কিছু নাগরিকের ওপর পরিচালিত এক গবেষণার পর একদল মনোরোগ বিশেষজ্ঞ সপ্রতি অভিমত প্রকাশ করেছেন, ফেইসবুকের মতো সামাজিক যোগাযোগের সাইটগুলো নার্সিসিজম চর্চা করার অন্যতম প্রধান মাধ্যম। আমাদের যুবসমাজ এর ব্যতিক্রম নয় এবং আমাদের তরুণসমাজের বেশির ভাগই ফেইসবুকিং করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপচয় করে। এমন মনোভাবের প্রধান কারণ হলো তারা ‘নার্সিসিসটিক ডিসঅর্ডার’ (যাকে সহজ ভাষায় এক ধরনের ব্যাধি বলা যেতে পারে) নামক একটি আধুনিক যুগের ব্যাধির দ্বারা প্রভাবিত এবং আক্রান্ত।
গ্রিক পৌরাণিক অনুসারে, প্রাচীন গ্রিসে নার্সিসাস নামে এক ব্যক্তি ছিল। সে এতটাই সুদর্শন ছিল যে পরীরাও তার প্রেমে পড়ে যায় কিন্তু পরীদের প্রেমের প্রস্তাব সে প্রত্যাখ্যান করেছিল। পরীদের তার জন্য এমন উন্মাদনা নার্সিসাসকে চরমভাবে প্রভাবিত করে এবং সে নিজেই নিজের রূপের প্রেমে পড়ে যায়। একবার নার্সিসাস পানিতে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে যায় এবং নিজের রূপের প্রতি ভালোবাসা কাটিয়ে উঠতে না পারার কারণে নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা তাকিয়ে থাকে। পৌরাণিক কাহিনীতে বলা আছে, নার্সিসাস নিজের প্রতিচ্ছবি দেখা অবস্থাতেই মৃত্যুবরণ করে এবং সেখান থেকে একটি ফুলগাছেরও উৎপত্তি হয়। মূলত সেখান থেকেই ‘নার্সিসিজমের’ ধারণাগত বিকাশ ঘটে এবং পরে ইতিহাসে স্বীকৃতি লাভ করে।
প্রাচীন গ্রিসে এই ব্যাধি বা সমস্যা ‘হাবরিস’ নামে পরিচিত ছিল এবং মজার ব্যাপার হলেও সত্যি যে, এই ব্যাধিকে আধুনিক যুগে আসার পর মনোবিজ্ঞানীরা একটি মনস্তাত্তি¡ক দৃষ্টিকোণ থেকে সংজ্ঞায়িত করতে সফল হয়েছে।
ফেইসবুক একটি খুবই জনপ্রিয় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, যেখানে মানুষের কার্যকলাপ এখন আর শুধু তথ্য ও ভাব আদান-প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় বরং এটি তরুণদের জন্য নার্সিসিজমের বৈশিষ্ট্যগুলো প্রদর্শনের জন্য খুব নিরাপদ ও নিখুঁত একটি সাইটে পরিণত হয়েছে। তরুণসমাজের অনেকেই (বিশেষত মেয়েরা) এখন ফেইসবুকে ছবি আপলোড এবং ট্যাগ করা নিয়ে ব্যস্ত সময় পার করে। এ ছাড়া তারা বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ছবি পোস্ট করাকে একটি আকর্ষণীয় কাজ মনে করে এবং এ জন্য ছবি তোলার সময় মোবাইলে বিভিন্ন ধরনের ফিল্টার ব্যবহার করে। অবাক করার বিষয় হলো, এদের মধ্যে অনেকের জন্যই ফেইসবুকে ছবি পোস্ট করা এবং অন্যের ছবিতে মন্তব্য করাটা তাদের মূল কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে এবং তদুপরি তারা এ জাতীয় কার্যকলাপকে সময়ের অপচয় হিসেবে বিবেচনা করে না।
আমরা প্রায়ই দেখি যে, যখনই কেউ ফেইসবুকে কোনো ছবি আপলোড করে, তখন সবাই প্রচুর মন্তব্য করে। কখনো কখনো সেসব মন্তব্য শালীনতার সীমা অতিক্রম করে। অনেকেই অবমাননাকর ও অশোভন মন্তব্য করে (বিশেষত মেয়েদের ছবির ক্ষেত্রে)। এমন মন্তব্য মেয়েদের বস্তু হিসেবে মূল্যায়নের আকাক্সক্ষা থেকে আবিভর্‚ত হয়। মার্টিন বুবার নামে এক অস্ট্রিয়ান দার্শনিক ১৯২৩ সালে ‘ইচ অ্যান্ড ডু’ (আমি এবং আপনি) শীর্ষক একটি প্রবন্ধ প্রকাশ করেন। যেখানে তিনি উল্লেখ করেন যে, আমাদের ‘নার্সিসিজম’ প্রায়ই এমনভাবে প্রভাবিত করে যে, আমরা অন্যদের নিজেদের সমকক্ষ না ভেবে বরং বস্তুরূপে বিবেচনা করি।
স্বনামধন্য দার্শনিক ও লেখক টমাস ডেভিড তার ‘নার্সিসিজম : বিহাইন্ড দ্য মাস্ক’ বইয়ে নার্সিসিজমের বেশ কিছু বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করেছেন। সেই বৈশিষ্ট্যগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্য কিছু হলোÑ উদ্ভট অঙ্গভঙ্গি ব্যবহার করা, এমন ব্যক্তিদের গ্রাহ্য করা, যারা তাদের প্রশংসা করে এবং যারা তাদের প্রশংসা করে না তাদের ঘৃণা করা, অন্যদের চেয়ে নিজেকে বেশি গুরুত্বপূর্ণ বলে ভান করা, নিজের অর্জনগুলোর অতিরঞ্জিতকরণ, নিজেকে সব বিষয়ে বিশেষজ্ঞ হিসেবে উপস্থাপন করার প্রচেষ্টা এবং অন্যের দৃষ্টিকোণ থেকে
পৃথিবী ও নিজের চারপাশকে দেখার অক্ষমতা।
উদাহরণস্বরূপ, সেদিন দেখলাম আমার এক ফেইসবুক বন্ধু তার প্রোফাইলে এক আত্মীয়ের জানাজায় অংশগ্রহণ করেছে এমন একটি ছবি পোস্ট দিয়েছে। ছবিতে তাকে বেশ উৎফুল্ল মনে হচ্ছে। কিন্তু এমনটা হওয়ার কথা না যদি আমরা সেই অনুষ্ঠানের গাম্ভীর্য বা গুরুত্ব বিবেচনায় নিই। যাই হোক, তারপরও সে ছবিটি তুলেছে এবং ফেইসবুকে পোস্ট দিয়েছে। আশ্চর্যজনক হলো, সেই ছবির নিচে অনেকেই এমন মন্তব্য করেছে (যেমন ধরুন দারুণ লাগছে), যা মোটেও কাম্য না। এই উদাহরণ থেকে এটা স্পষ্ট যে, আমরা ফেইসবুকে এক ধরনের কল্পনার জগতে বসবাস করি এবং আমরা নির্লজ্জের মতো কাজকর্ম করি। অনেকেই সমবেদনা জানানোর পরিবর্তে দেখতে কেমন লাগছে সেটা নিয়ে মন্তব্য করছিল। এমন কার্যকলাপ থেকে এটা বুঝতে কষ্ট হয় না যে, অনেক ফেইসবুক ব্যবহারকারী অন্যের দৃষ্টিভঙ্গি থেকে পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিচার করা বন্ধ করে দিয়েছে। আমেরিকান দার্শনিক হচকিসের মতে, এমন নির্লজ্জতাও নার্সিসিজমের লক্ষণ।
প্রকৃতপক্ষে নার্সিসিজমের এমন নির্লজ্জ প্রদর্শন আমাদের যুবসমাজের জন্য মোটেও ভালো নয়। তবে আধুনিক বিশ্বের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলাটা যদি আমাদের জন্য খুব গুরুত্ব বহন করে, তাহলে আমরা সর্বোচ্চ নার্সিসিজমের ভালো দিকগুলো (হেলদি নার্সিসিজম) অনুশীলন করতে পারি। অস্ট্রিয়ান মনোবিজ্ঞানী ফ্রয়েড ১৯১৪ সালে ‘নার্সিসিজম : অ্যান ইন্ট্রোডাকশন’ নামক প্রবন্ধে হেলদি নার্সিসিজমকে সংজ্ঞায়িত করেন। তিনি বলেন, ‘হেলদি নার্সিসিজম’ সব ব্যক্তির মধ্যে থাকতে পারে এবং এমন ভাবনা একজন মানুষের স্বাভাবিক বিকাশের অংশ হতে পারে। যেমনÑ সন্তানের প্রতি বাবা-মায়ের ভালোবাসা এবং তাদের মনোভাবকে ‘হেলদি নার্সিসিজম’ হিসেবে মূল্যায়ন করা যেতে পারে। সাধারণত বাবা-মায়েরা নিজেরা যে উচ্চতায় কখনো পৌঁছাতে পারেননি, তারা সেই উচ্চতায় নিজেদের সন্তানকে দেখতে চান এবং নিরপেক্ষভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যায়, বাবা-মায়েরা তাদের সন্তানের গুণাবলিগুলো অনেক ক্ষেত্রেই অতিরিক্ত মূল্যায়ন করেন। এমন মনোভাব থাকাটা যুুক্তিসংগত এবং একে ‘হেলদি নার্সিসিজম’ বলে। আমাদের তরুণ প্রজন্ম এমন হেলদি নার্সিসিজমের চর্চা করতে পারে। এমনটা করতে পারলে আমরা ফেইসবুক এবং অন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমগুলোকে সবার কাছে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারব।
Subscribe to:
Post Comments (Atom)
No comments:
Post a Comment